Study Library / বাংলা ভাষা ও সাহিত্য / বাংলা সাহিত্য
🆓 Free 10 min read

ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর

By SHIKKHA GURU
ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর (১৮২০-১৮৯১) বাংলার নবজাগরণের সর্বশ্রেষ্ঠ পুরুষদের অন্যতম। তিনি একাধারে শিক্ষাবিদ, সমাজসংস্কারক, সাহিত্যিক, দার্শনিক ও মানবহিতৈষী। সমসাময়িক কালে রাজা রামমোহন রায় যেমন ধর্মীয় সংস্কারে অগ্রণী ছিলেন, বিদ্যাসাগর তেমনি শিক্ষাবিস্তার, নারীমুক্তি ও সামাজিক আইন সংস্কারে অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন।

---

### জীবনের প্রথম পর্ব ও শিক্ষাজীবন

ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর ১৮২০ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর পশ্চিমবঙ্গের মেদিনীপুর জেলার বীরসিংহ গ্রামে এক অতি দরিদ্র ব্রাহ্মণ পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম ঠাকুরদাস বন্দ্যোপাধ্যায় এবং মাতার নাম ভগবতী দেবী। শৈশবেই তিনি প্রখর মেধার পরিচয় দেন। গ্রামের পাঠশালায় কিছুদিন পড়ার পর তিনি কলকাতায় এসে সংস্কৃত কলেজে ভর্তি হন। অত্যন্ত কষ্টের মধ্যে তাঁর পড়াশোনা চলত; অভাবের কারণে প্রায়শই একবেলা উপোস করে পড়তে হতো। কিন্তু তাঁর অদম্য জ্ঞানপিপাসা ও কঠোর পরিশ্রমের ফলে সংস্কৃত ভাষায় তিনি অসাধারণ পাণ্ডিত্য অর্জন করেন। ন্যায়শাস্ত্র, ব্যাকরণ, সাহিত্য, অলঙ্কার, বেদান্ত প্রভৃতি শাস্ত্রে তিনি বিশেষ দক্ষতা লাভ করেন। সংস্কৃত কলেজ থেকে কৃতিত্বের সাথে উত্তীর্ণ হয়ে তিনি 'বিদ্যাসাগর' উপাধিতে ভূষিত হন, যার অর্থ জ্ঞানের সাগর। অল্প বয়সেই তিনি ফোর্ট উইলিয়াম কলেজে সংস্কৃত অধ্যাপক হিসেবে যোগ দেন এবং পরে সংস্কৃত কলেজের অধ্যক্ষ পদে উন্নীত হন।

---

### শিক্ষাবিস্তারে অসামান্য অবদান

ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর বাংলার শিক্ষাব্যবস্থার আমূল সংস্কার সাধন করেন। তিনি উপলব্ধি করেছিলেন যে সমাজের উন্নতি কেবলমাত্র শিক্ষার মাধ্যমেই সম্ভব, তাই তিনি সারা জীবন শিক্ষাবিস্তারে নিরলস কাজ করে গেছেন।

প্রথমত, তিনি সংস্কৃত কলেজে পাঠ্যপুস্তক সংস্কার করেন। তাঁর সময়ে সংস্কৃত কলেজে অযথা জটিল ও অপ্রয়োজনীয় বিষয় পড়ানো হতো। তিনি পাশ্চাত্য বিজ্ঞান, দর্শন ও ইংরেজি সাহিত্যকে সংস্কৃত শিক্ষার অঙ্গীভূত করার উদ্যোগ নেন। তিনি ইংরেজি ও সংস্কৃত উভয় ভাষায় ডাবল পাঠ্যক্রম চালু করেন, যা ছিল শিক্ষার ইতিহাসে যুগান্তকারী পদক্ষেপ।

দ্বিতীয়ত, তিনি বাংলা ভাষায় সহজ, সরল ও সুপাঠ্য পাঠ্যপুস্তক রচনা করেন। ১৮৪৭ সালে প্রকাশিত তাঁর **'বর্ণপরিচয়'** বাংলা ভাষার প্রথম আধুনিক প্রাইমার বা শিশুপাঠ্য। এই বইটি অত্যন্ত সাবলীল ও বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে রচিত এবং আজও প্রায় দেড়শো বছর পরে বহু স্কুলে পাঠ্যবই হিসেবে ব্যবহৃত হয়। এছাড়া তিনি **'ব্যাকরণ কৌমুদী'**, **'সীতার বনবাস'**, **'ভ্রান্তিবিলাস'** প্রভৃতি গ্রন্থ রচনা করে বাংলা গদ্যকে তার কৃত্রিমতা ও সংস্কৃতনির্ভর জটিলতা থেকে মুক্ত করেন। তাঁর গদ্য ছিল অত্যন্ত পরিষ্কার, যুক্তিনিষ্ঠ ও প্রাঞ্জল, যা বাংলা গদ্যের উন্নয়নে এক মাইলফলক।

তৃতীয়ত, তিনি নারীশিক্ষার জন্য বিশেষ উদ্যোগ গ্রহণ করেন। সেই সময়ে মেয়েদের লেখাপড়া শেখানো ছিল সমাজের চোখে পাপ। বিদ্যাসাগর এর বিপরীতে একের পর এক বালিকা বিদ্যালয় স্থাপন করেন। তাঁর নিজ উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত বহু বালিকা বিদ্যালয় বাংলায় নারীশিক্ষার পথ প্রশস্ত করে। তিনি মনে করতেন, যতদিন মেয়েরা শিক্ষিত না হবে, ততদিন সমাজের প্রকৃত উন্নতি সম্ভব নয়।

---

### বিধবা বিবাহ আন্দোলন ও সামাজিক সংস্কার

ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের সবচেয়ে বড় ও সাহসী কীর্তি হলো বিধবা বিবাহ আন্দোলন। ঊনবিংশ শতকের বাংলায় শাস্ত্রীয় বিধান অনুযায়ী হিন্দু বিধবাদের পুনর্বিবাহ নিষিদ্ধ ছিল। ফলে অল্পবয়সী মেয়েরা স্বামী মারা গেলে সারাজীবন চরম অবহেলা, নির্যাতন ও সামাজিক বয়কটের শিকার হতো। বিদ্যাসাগর এই অন্যায়ের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ জানান।

তিনি বাংলার প্রাচীন ধর্মশাস্ত্র গভীরভাবে অধ্যয়ন করে প্রমাণ করেন যে, বিধবা বিবাহ নিষিদ্ধ নয় বরং বৈদিক যুগে এর অস্তিত্ব ছিল। তিনি সরকারের কাছে এক বিরাট স্মারকলিপি পেশ করেন এবং প্যারিস, লন্ডন ও কলকাতার বহু পণ্ডিতের মতামত সংগ্রহ করেন। অক্লান্ত প্রচারণা, তর্কবিতর্ক ও যুক্তিনিষ্ঠ আলোচনার মাধ্যমে ১৮৫৬ সালে তিনি **'বিধবা বিবাহ আইন'** (হিন্দু উইডো রিম্যারেজ অ্যাক্ট) পাস করাতে সক্ষম হন। এই আইনের মাধ্যমে বৈধভাবে বিধবা বিবাহের পথ উন্মুক্ত হয়। এই আইন পাস হওয়ার পর তিনি নিজের ছেলেকে নিয়ে প্রথম এই আইনের আওতায় বিধবা বিবাহের আয়োজন করেন, যাতে সমাজে এর উদাহরণ সৃষ্টি হয়। এই সাহসী পদক্ষেপের জন্য তিনি রক্ষণশীল সমাজের তীব্র গালিগালাজ ও শারীরিক হুমকির শিকার হন, কিন্তু তিনি কখনও পিছপা হননি।

এছাড়া তিনি বহুবিবাহ প্রথা, বাল্যবিবাহ ও কৌলীন্য প্রথার বিরুদ্ধেও সরব হন। তিনি প্রমাণ করেন যে কৌলীন্য প্রথার কারণে ব্রাহ্মণ সমাজে বহুবিবাহ চরম পর্যায়ে পৌঁছেছিল, যা নারীদের জীবনে অশেষ যন্ত্রণা সৃষ্টি করেছিল। তিনি এই প্রথা বিলোপের জন্য আইন প্রণয়নের উদ্যোগ নেন, যদিও তাঁর জীবদ্দশায় তা সম্পূর্ণ সফল হয়নি।

---

### সাহিত্যকর্ম ও ভাষাশৈলী

ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে এক বিরল প্রতিভা। তিনি সংস্কৃত সাহিত্যের অসংখ্য গ্রন্থ বাংলায় অনুবাদ করেন, যা বাংলা ভাষাভাষী সাধারণ মানুষকে সংস্কৃত সাহিত্যের রসাস্বাদনের সুযোগ করে দেয়।

তাঁর উল্লেখযোগ্য অনুবাদগ্রন্থগুলো হলো:
- **'শকুন্তলা'** – কালিদাসের বিখ্যাত নাটকের বাংলা অনুবাদ, যা বাংলা গদ্য সাহিত্যের এক অমূল্য সম্পদ।
- **'মেঘদূত'** – কালিদাসের আরেকটি শ্রেষ্ঠ কাব্যের গদ্য অনুবাদ।
- **'সীতার বনবাস'** – ভবভূতির 'উত্তররামচরিত' নাটকের অনুবাদ।

মূল রচনার মধ্যে তাঁর **'জীবনচরিত'** অত্যন্ত জনপ্রিয় হয়, যেখানে তিনি সক্ৰেটিস, সলন, সিজার প্রমুখ পাশ্চাত্য মহামানবদের জীবনী বাংলায় রচনা করেন। এটি বাংলায় জীবনী সাহিত্যের এক অসাধারণ নিদর্শন। এছাড়া তিনি **'বোধোদয়'**, **'কথামালা'**, **'চরিতাবলী'** প্রভৃতি শিশুসাহিত্য গ্রন্থ রচনা করেন, যা শিশুমনে নৈতিকতা ও জ্ঞানের বীজ বপন করে।

তাঁর ভাষাশৈলী ছিল অম্লান, সংযত ও প্রাঞ্জল। তিনি সংস্কৃত শব্দ ব্যবহার করলেও তা এমনভাবে সহজ ও সুন্দরভাবে সাজাতেন যে সাধারণ পাঠকও তা সহজেই উপলব্ধি করতে পারত। বাংলা গদ্যকে তিনি তার জটিলতা থেকে মুক্ত করে একটি পরিষ্কার, সুসংহত ও শৈল্পিক রূপ দান করেন। তাই তাকে 'বাংলা গদ্যের জনক' বলা হয়।

---

### মানবহিতৈষী ও দার্শনিক মন

শুধু শিক্ষাবিদ ও সংস্কারক নয়, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর ছিলেন এক অসাধারণ মানবহিতৈষী। তাঁর দানশীলতা ও পরহিতব্রতী মনোভাব কিংবদন্তি। তিনি নিজে অত্যন্ত সাদাসিধে জীবনযাপন করতেন, কিন্তু প্রতিবেশী, আত্মীয়স্বজন বা অজানা কোনো দরিদ্র মানুষকে সাহায্য করতে তিনি কখনও কুণ্ঠিত হতেন না। তিনি বিপুল অর্থ উপার্জন করলেও তার অধিকাংশই দান করে দিতেন। তাঁর বাড়ি ছিল অসহায় মানুষদের আশ্রয়স্থল।

তিনি ছিলেন অত্যন্ত নীতিনিষ্ঠ ও সত্যবাদী। ইংরেজ সরকার তাঁকে নাইট উপাধি দিতে চাইলে তিনি তা প্রত্যাখ্যান করেন, কারণ তিনি নিজেকে কারও অধীনস্থ মনে করতেন না। তিনি ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে সরাসরি রাজনীতি না করলেও, স্বদেশি শিল্প, শিক্ষা ও সংস্কৃতির প্রতি তাঁর গভীর অনুরাগ ছিল। তিনি চেয়েছিলেন ভারতবর্ষ তার নিজস্ব ঐতিহ্য ধরে রেখে পাশ্চাত্য বিজ্ঞান ও শিক্ষাকে আত্মস্থ করুক।

---

### শেষ জীবন ও মৃত্যু

জীবনের শেষ দিকে বিদ্যাসাগর কলকাতার শোভাবাজারে থাকতেন। এই সময় তিনি ব্যক্তিগতভাবে অনেক দুর্ভোগ ও পারিবারিক শোক সহ্য করেন। তাঁর কয়েকজন সন্তান অকালে মারা যায়, যা তাঁকে গভীরভাবে ব্যথিত করে। তা সত্ত্বেও তিনি সমাজসংস্কারের কাজ চালিয়ে যান। অন্ধবিশ্বাস ও কুসংস্কারের বিরুদ্ধে তিনি শেষ বয়স পর্যন্ত লেখালেখি ও বক্তৃতা দিয়ে গেছেন।

১৮৯১ সালের ২৯ জুলাই তিনি কলকাতায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তাঁর মৃত্যুতে বাংলার শিক্ষিত সমাজ ও সাধারণ মানুষ গভীর শোকাহত হয়। বাংলার নবজাগরণের এই মহান পুরুষের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে কলকাতায় বিশাল শোভাযাত্রা বের হয় এবং সাহিত্যিক বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় পর্যন্ত তাঁর মৃত্যুতে এক অভূতপূর্ব শ্রদ্ধার্ঘ্য নিবেদন করেন।

---

### মূল্যায়ন

ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর ছিলেন যুগস্রষ্টা। তিনি শুধু বাংলা সাহিত্য ও শিক্ষার ভিত্তি নির্মাণ করেননি, তিনি সমাজের গোড়ায় প্রচলিত অমানবিক প্রথাগুলোর বিরুদ্ধে লড়াই করে নারীমুক্তির পথও প্রশস্ত করেন। দারিদ্র্য, অজ্ঞতা ও ধর্মীয় গোঁড়ামির বিরুদ্ধে তাঁর আজীবন সংগ্রাম বাংলার ইতিহাসকে একটি উন্নত, মানবিক ও যুক্তিনিষ্ঠ সমাজের দিকে পরিচালিত করে। তাঁর রচিত 'বর্ণপরিচয়' যেমন আজও শিশুপাঠ্য, তেমনই তাঁর বিধবা বিবাহ আইন ও নারীশিক্ষার উদ্যোগ বাংলার সমাজব্যবস্থাকে চিরতরে বদলে দেয়। তাই আজও তিনি বাংলার হৃদয়ে 'বিদ্যাসাগর' নামে অমর হয়ে আছেন—জ্ঞানের সাগর, যার গভীরতা ও বিশালতা কখনও শেষ হয় না।