বাংলা সাহিত্যের আধুনিক যুগের সূচনা
ভূমিকা
বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসকে সাধারণত তিনটি প্রধান পর্বে ভাগ করা হয় — প্রাচীন যুগ (আনুমানিক ৬৫০-১২০০ খ্রিস্টাব্দ), মধ্যযুগ (আনুমানিক ১২০১-১৮০০ খ্রিস্টাব্দ), এবং আধুনিক যুগ (১৮০০ খ্রিস্টাব্দ থেকে বর্তমান পর্যন্ত)। আধুনিক যুগের সূচনাকাল নিয়ে সাহিত্য-ঐতিহাসিকদের মধ্যে মতভেদ থাকলেও, ঊনবিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধকেই এই যুগের সূচনাবিন্দু হিসেবে সাধারণভাবে চিহ্নিত করা হয়। এই লেখায় সেই রূপান্তরকালের প্রেক্ষাপট, পর্যায়ক্রম এবং সেই সময়ের উল্লেখযোগ্য লেখক ও তাঁদের গ্রন্থাবলি বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হলো।
যুগবিভাগ নিয়ে মতভেদ
- সুকুমার সেন ১৮০১ সালে ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ প্রতিষ্ঠাকে আধুনিক যুগের সূচনাবিন্দু হিসেবে ধরেন।
- অসিতকুমার বন্দ্যোপাধ্যায় ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্তের আবির্ভাবকাল (১৮৩০-এর দশক) থেকে আধুনিক যুগের প্রকৃত সূচনা বলে মনে করেন।
- অনেক পণ্ডিত মাইকেল মধুসূদন দত্ত-র আবির্ভাবকে (১৮৬০-এর দশক) প্রকৃত আধুনিকতার সূচনা বলে চিহ্নিত করেন, কেননা তাঁর হাতেই বাংলা সাহিত্য পাশ্চাত্য আঙ্গিক ও ভাবধারার সাথে পূর্ণাঙ্গ সংযোগ স্থাপন করে।
এই মতভেদের ভিত্তিতে আধুনিক যুগকে সুবিধার জন্য কয়েকটি উপ-পর্যায়ে ভাগ করে আলোচনা করা যেতে পারে:
- প্রস্তুতি পর্ব / সন্ধিক্ষণ (১৮০০-১৮৩০) — ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ, শ্রীরামপুর মিশন
- প্রাক-আধুনিক গদ্য ও সাময়িকপত্র পর্ব (১৮৩০-১৮৬০) — ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত, রামমোহন রায়, বিদ্যাসাগর যুগ
- পূর্ণাঙ্গ আধুনিক যুগ (১৮৬০-এর পর) — মাইকেল মধুসূদন দত্ত, বঙ্কিমচন্দ্র, এবং পরবর্তী কবি-ঔপন্যাসিকগণ
আধুনিক যুগের সূচনার প্রেক্ষাপট ও কারণ
১. ব্রিটিশ শাসন ও পাশ্চাত্য শিক্ষার প্রভাব
পলাশীর যুদ্ধের (১৭৫৭) পর বাংলায় ব্রিটিশ শাসন প্রতিষ্ঠিত হওয়ার সাথে সাথে পাশ্চাত্য শিক্ষা, চিন্তাধারা ও সাহিত্যের সংস্পর্শে আসে বাঙালি সমাজ। ইংরেজি শিক্ষার প্রসার (হিন্দু কলেজ প্রতিষ্ঠা, ১৮১৭) বাঙালি মনীষীদের যুক্তিবাদ, ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবোধ ও বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গির সাথে পরিচিত করে।
২. ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ (১৮০০) ও তার লেখকগোষ্ঠী
কলকাতায় প্রতিষ্ঠিত ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ আধুনিক বাংলা গদ্যের বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ব্রিটিশ প্রশাসকদের বাংলা ভাষা শেখানোর উদ্দেশ্যে প্রতিষ্ঠিত এই কলেজে নিম্নলিখিত পণ্ডিতরা গদ্যরচনায় নিয়োজিত হন:
- উইলিয়াম কেরি — কলেজের বাংলা বিভাগের প্রধান পণ্ডিত; কথোপকথন (১৮০১), বাংলা ব্যাকরণ রচয়িতা।
- রামরাম বসু — প্রতাপাদিত্য চরিত্র (১৮০১), লিপিমালা (১৮০২)।
- মৃত্যুঞ্জয় বিদ্যালঙ্কার — বত্রিশ সিংহাসন (১৮০২), হিতোপদেশ (১৮০৮), প্রবোধ চন্দ্রিকা (১৮৩৩)।
- চণ্ডীচরণ মুন্শী — তোতা ইতিহাস (১৮০৫)।
- হরপ্রসাদ রায় — পুরুষ পরীক্ষা (১৮১৫)।
এই রচনাগুলো সাহিত্যিক মূল্যে সীমিত হলেও আধুনিক বাংলা গদ্যের কাঠামো নির্মাণে এদের ঐতিহাসিক গুরুত্ব অপরিসীম। এদের হাতেই সাধু বাংলা গদ্যরীতির প্রাথমিক রূপ তৈরি হয়।
৩. শ্রীরামপুর মিশন ও মুদ্রণযন্ত্রের প্রসার
১৮০০ সালে উইলিয়াম কেরি, উইলিয়াম ওয়ার্ড ও জোশুয়া মার্শম্যান এর নেতৃত্বে শ্রীরামপুর মিশন প্রেস স্থাপিত হয়, যা বাংলা মুদ্রণের সূচনা করে। এখান থেকে বাইবেলের বঙ্গানুবাদ এবং বিভিন্ন পাঠ্যপুস্তক মুদ্রিত হয়। পরবর্তীতে গুরুত্বপূর্ণ সাময়িকপত্র প্রকাশিত হতে থাকে:
- দিগ্দর্শন (১৮১৮) — জন ক্লার্ক মার্শম্যান সম্পাদিত, প্রথম বাংলা সাময়িকপত্র।
- সমাচার দর্পণ (১৮১৮) — প্রথম বাংলা সংবাদপত্র, শ্রীরামপুর মিশন থেকে প্রকাশিত।
- সংবাদ প্রভাকর (১৮৩১) — ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত সম্পাদিত, প্রথমে সাপ্তাহিক পরে দৈনিক।
- তত্ত্ববোধিনী পত্রিকা (১৮৪৩) — অক্ষয়কুমার দত্ত সম্পাদিত, ব্রাহ্মসমাজের মুখপত্র।
- বঙ্গদর্শন (১৮৭২) — বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় সম্পাদিত, আধুনিক বাংলা সাহিত্য-সাময়িকীর শ্রেষ্ঠ দৃষ্টান্ত।
মুদ্রণযন্ত্রের প্রসার সাহিত্যকে পুঁথি-নির্ভরতা থেকে মুক্ত করে ব্যাপক পাঠকগোষ্ঠীর কাছে পৌঁছে দেয়, যা আধুনিক সাহিত্যের বিকাশের অপরিহার্য শর্ত ছিল।
সামাজিক সংস্কার আন্দোলন ও প্রাবন্ধিক-গদ্যকারগণ
রামমোহন রায় (১৭৭২-১৮৩৩)
"আধুনিক ভারতের জনক" নামে পরিচিত রামমোহন রায় বাংলা প্রবন্ধ সাহিত্যের ভিত্তি স্থাপন করেন। তাঁর উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ:
- বেদান্ত গ্রন্থ (১৮১৫)
- বেদান্তসার (১৮১৫)
- গোস্বামীর সহিত বিচার (১৮১৮)
- সহমরণ বিষয়ে প্রবর্তক ও নিবর্তকের সম্বাদ (১৮১৮) — সতীদাহ প্রথার বিরুদ্ধে যুক্তিতর্ক
- ব্রাহ্মণ সেবধি (পত্রিকা, ১৮২১)
- সংবাদ কৌমুদী (পত্রিকা, ১৮২১)
তাঁর গদ্যরীতি জটিল ও সংস্কৃতঘেঁষা হলেও যুক্তিনির্ভর তর্ক-বিন্যাসের মাধ্যমে বাংলা প্রবন্ধকে একটি শক্তিশালী ভিত্তি প্রদান করে।
ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর (১৮২০-১৮৯১)
আধুনিক বাংলা গদ্যরীতির প্রকৃত রূপকার হিসেবে বিদ্যাসাগরকে গণ্য করা হয়। তাঁর ভাষা সহজ, স্বচ্ছ ও ছন্দোময়। উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ:
- বেতাল পঞ্চবিংশতি (১৮৪৭) — অনুবাদ গ্রন্থ
- বাংলার ইতিহাস (১৮৪৮)
- জীবনচরিত (১৮৪৯)
- বোধোদয় (১৮৫১)
- বর্ণপরিচয় (প্রথম ও দ্বিতীয় ভাগ) (১৮৫৫) — বাংলা বর্ণমালা শিক্ষার আদর্শ পুস্তক
- সীতার বনবাস (১৮৬০)
- শকুন্তলা (১৮৫৪)
- বিধবাবিবাহ প্রচলিত হওয়া উচিত কিনা এতদ্বিষয়ক প্রস্তাব (১৮৫৫)
- বহুবিবাহ রহিত হওয়া উচিত কিনা এতদ্বিষয়ক বিচার (১৮৭১)
অক্ষয়কুমার দত্ত (১৮২০-১৮৮৬)
বিজ্ঞানভিত্তিক ও যুক্তিনির্ভর বাংলা গদ্যের অন্যতম পথিকৃৎ। উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ:
- ভূগোল (১৮৪১)
- পদার্থবিদ্যা (১৮৫৬)
- চারুপাঠ (১ম, ২য়, ৩য় ভাগ) (১৮৫৩-৫৯)
- ভারতবর্ষীয় উপাসক সম্প্রদায় (১৮৭০)
সাময়িকপত্র-কেন্দ্রিক কবিতা ও ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত
ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত (১৮১২-১৮৫৯) কে অনেকে মধ্যযুগ ও আধুনিক যুগের সন্ধিস্থলের কবি বলে অভিহিত করেন। তাঁর কবিতায় বিষয়বস্তু সমকালীন সমাজ-জীবন হলেও রীতি ছিল পুরনো পাঁচালী ও কবিওয়ালাদের ধাঁচের কাছাকাছি। তিনি সংবাদ প্রভাকর পত্রিকার মাধ্যমে বহু নতুন কবি-সাহিত্যিককে (যেমন বঙ্কিমচন্দ্র, দীনবন্ধু মিত্র) সাহিত্যজগতে পরিচিত করান। তাঁর গ্রন্থ:
- সংবাদ প্রভাকর (সাময়িকপত্র, ১৮৩১)
- প্রবোধ প্রভাকর (১৮৫৩)
- বোধেন্দুবিকাশ (১৮৬৩, মরণোত্তর প্রকাশিত)
কাব্যক্ষেত্রে আধুনিকতার পূর্ণ সূচনা: মাইকেল মধুসূদন দত্ত
মাইকেল মধুসূদন দত্ত (১৮২৪-১৮৭৩) কে বাংলা সাহিত্যের প্রথম প্রকৃত আধুনিক কবি বলা হয়। তিনি বাংলা কবিতায় অমিত্রাক্ষর ছন্দ (মিলহীন পয়ার, blank verse) প্রবর্তন করেন এবং পাশ্চাত্য মহাকাব্যিক আঙ্গিকে বাংলা কাব্য রচনা করেন। তাঁর উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ:
- তিলোত্তমাসম্ভব কাব্য (১৮৬০) — অমিত্রাক্ষর ছন্দে রচিত প্রথম কাব্য
- মেঘনাদবধ কাব্য (১৮৬১) — নয় সর্গে বিভক্ত মহাকাব্য, রামায়ণের কাহিনি অবলম্বনে রচিত হলেও রাবণ-পুত্র মেঘনাদকে ট্র্যাজিক নায়ক রূপে উপস্থাপন
- ব্রজাঙ্গনা কাব্য (১৮৬১)
- বীরাঙ্গনা কাব্য (১৮৬২) — পত্রকাব্য (epistolary poems)
- চতুর্দশপদী কবিতাবলী (১৮৬৬) — বাংলা ভাষায় সনেট (sonnet) রীতির প্রথম প্রয়োগ
- শর্মিষ্ঠা (নাটক, ১৮৫৯) — প্রথম মৌলিক বাংলা নাটক
- পদ্মাবতী (নাটক, ১৮৬০)
- কৃষ্ণকুমারী (নাটক, ১৮৬১)
- একেই কি বলে সভ্যতা (প্রহসন, ১৮৬০)
- বুড়ো শালিকের ঘাড়ে রোঁ (প্রহসন, ১৮৬০)
- হেকটর বধ (গদ্য অনুবাদ, ১৮৭১)
নাট্যসাহিত্যে আধুনিকতা
মাইকেল ছাড়াও এই সময়ে নাট্যসাহিত্যে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন:
- দীনবন্ধু মিত্র (১৮৩০-১৮৭৩) — নীলদর্পণ (১৮৬০), নীলচাষিদের উপর অত্যাচারের চিত্র তুলে ধরা যুগান্তকারী নাটক; অন্যান্য নাটক: নবীন তপস্বিনী (১৮৬৩), লীলাবতী (১৮৬৭), জামাই বারিক (প্রহসন)।
- রামনারায়ণ তর্করত্ন — কুলীনকুলসর্বস্ব (১৮৫৪), নবনাটক (১৮৬৬)।
উপন্যাস সাহিত্যের সূচনা
প্যারীচাঁদ মিত্র (১৮১৪-১৮৮৩)
ছদ্মনাম "টেকচাঁদ ঠাকুর"-এ রচিত তাঁর আলালের ঘরের দুলাল (১৮৫৮) কে বাংলা উপন্যাস সাহিত্যের প্রথম উল্লেখযোগ্য প্রচেষ্টা এবং কথ্যরীতির (আলালী ভাষা) প্রথম সার্থক ব্যবহার বলে গণ্য করা হয়।
কালীপ্রসন্ন সিংহ (১৮৪০-১৮৭০)
হুতোম প্যাঁচার নকশা (১৮৬১-৬২) — সমকালীন কলকাতার সমাজচিত্র তুলে ধরা ব্যঙ্গাত্মক রচনা, প্রাঞ্জল কথ্যরীতির চমৎকার নিদর্শন।
বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় (১৮৩৮-১৮৯৪)
"আধুনিক বাংলা উপন্যাসের জনক" হিসেবে পরিচিত বঙ্কিমচন্দ্র বাংলা উপন্যাসকে শৈল্পিক পূর্ণতা দান করেন। তাঁর গ্রন্থতালিকা:
- দুর্গেশনন্দিনী (১৮৬৫) — প্রথম সার্থক বাংলা উপন্যাস
- কপালকুণ্ডলা (১৮৬৬)
- মৃণালিনী (১৮৬৯)
- বিষবৃক্ষ (১৮৭৩)
- চন্দ্রশেখর (১৮৭৫)
- রজনী (১৮৭৭)
- কৃষ্ণকান্তের উইল (১৮৭৮)
- আনন্দমঠ (১৮৮২) — "বন্দে মাতরম" সংগীতের উৎসগ্রন্থ, স্বদেশপ্রেমমূলক উপন্যাস
- দেবী চৌধুরাণী (১৮৮৪)
- সীতারাম (১৮৮৬)
- কমলাকান্তের দপ্তর (প্রবন্ধ-সংকলন, ১৮৭৫)
- বঙ্গদর্শন (সাময়িকপত্র সম্পাদনা, ১৮৭২)
ভূদেব মুখোপাধ্যায় (১৮২৭-১৮৯৪)
অঙ্গুরীয় বিনিময় (১৮৭৫), পুষ্পাঞ্জলি (১৮৭৬) — ঐতিহাসিক ও সামাজিক বিষয় নিয়ে রচিত।
কাব্যক্ষেত্রে মাইকেল-উত্তর ধারা
- হেমচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় (১৮৩৮-১৯০৩) — বৃত্রসংহার কাব্য (১৮৭৫), ভারত সঙ্গীত (১৮৭০), স্বদেশপ্রেমমূলক কবিতার জন্য পরিচিত।
- নবীনচন্দ্র সেন (১৮৪৭-১৯০৯) — পলাশীর যুদ্ধ (১৮৭৫), রৈবতক-কুরুক্ষেত্র-প্রভাস (ত্রয়ী কাব্য)।
- রঙ্গলাল বন্দ্যোপাধ্যায় (১৮২৭-১৮৮৭) — পদ্মিনী উপাখ্যান (১৮৫৮), যা পরবর্তীতে স্বদেশপ্রেমের প্রেরণাদায়ক কাব্য হিসেবে গণ্য হয়।
- বিহারীলাল চক্রবর্তী (১৮৩৫-১৮৯৪) — গীতিকবিতার (lyric) পথপ্রদর্শক, রবীন্দ্রনাথের পূর্বসূরি বলে বিবেচিত; সঙ্গীত শতক (১৮৬২), বন্ধুবিয়োগ (১৮৭০), সারদামঙ্গল (১৮৭৯)।
রবীন্দ্র-পূর্ব যুগের পূর্ণতা ও রবীন্দ্রনাথের আবির্ভাব
উনবিংশ শতাব্দীর শেষভাগে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (১৮৬১-১৯৪১) এর আবির্ভাবের মাধ্যমে বাংলা সাহিত্যের আধুনিক যুগ পূর্ণতা লাভ করে। তাঁর প্রথম দিকের উল্লেখযোগ্য রচনা:
- বনফুল (কাব্য, ১৮৮০)
- সন্ধ্যাসঙ্গীত (১৮৮২)
- প্রভাতসঙ্গীত (১৮৮৩)
- মানসী (১৮৯০)
- সোনার তরী (১৮৯৪)
- ছোটগল্প-সংকলন (গল্পগুচ্ছ-এর প্রাথমিক গল্পগুলি, ১৮৯১ থেকে হিতবাদী, সাধনা পত্রিকায় প্রকাশিত)
রবীন্দ্রনাথের হাতে কবিতা, ছোটগল্প, উপন্যাস, নাটক, প্রবন্ধ — সাহিত্যের প্রতিটি শাখায় আধুনিকতার পূর্ণ বিকাশ ঘটে।
আধুনিক যুগের প্রধান সাহিত্যিক বৈশিষ্ট্য (সারসংক্ষেপ)
| বৈশিষ্ট্য | মধ্যযুগীয় সাহিত্য | আধুনিক সাহিত্য |
|---|---|---|
| প্রধান রূপ | পদ্য | গদ্য ও পদ্য উভয়ই সমান গুরুত্বপূর্ণ |
| বিষয়বস্তু | ধর্মীয়, পৌরাণিক | সামাজিক বাস্তবতা, ব্যক্তিমানস |
| দৃষ্টিভঙ্গি | সমষ্টিগত, ভক্তিমূলক | ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদী, যুক্তিনির্ভর |
| আঙ্গিক | মঙ্গলকাব্য, পাঁচালী | উপন্যাস, ছোটগল্প, সনেট, অমিত্রাক্ষর ছন্দ |
| ছন্দ | পয়ার, ত্রিপদী | অমিত্রাক্ষর, মুক্তক ছন্দ |
| পৃষ্ঠপোষকতা | রাজরাজড়া, জমিদার | মুদ্রণযন্ত্র, সাময়িকপত্র, ব্যাপক পাঠকশ্রেণি |
উপসংহার
বাংলা সাহিত্যের আধুনিক যুগের সূচনা একটি জটিল ও বহুস্তরীয় ঐতিহাসিক প্রক্রিয়া। ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের পণ্ডিতদের (উইলিয়াম কেরি, রামরাম বসু, মৃত্যুঞ্জয় বিদ্যালঙ্কার) হাতে গদ্যের প্রাথমিক কাঠামো নির্মিত হওয়ার পর, রামমোহন রায় ও বিদ্যাসাগরের হাতে তা যুক্তিনির্ভর ও পরিমার্জিত রূপ লাভ করে। ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্তের সাংবাদিকতা-কেন্দ্রিক কবিতার মধ্য দিয়ে সন্ধিক্ষণ অতিক্রম করে, মাইকেল মধুসূদন দত্তের হাতে (অমিত্রাক্ষর ছন্দ, মহাকাব্য, সনেট, আধুনিক নাটক) কবিতা সম্পূর্ণ নতুন আঙ্গিক লাভ করে। একই সময়ে প্যারীচাঁদ মিত্র ও বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের হাতে উপন্যাস একটি পরিণত শিল্পমাধ্যম হিসেবে প্রতিষ্ঠা পায়। এই সমগ্র যাত্রা চূড়ান্ত পূর্ণতা লাভ করে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের হাতে, যাঁর বহুমুখী প্রতিভা বাংলা সাহিত্যকে বিশ্বসাহিত্যের মানে উন্নীত করে।