Study Library / বাংলা ভাষা ও সাহিত্য / বাংলা সাহিত্য
🆓 Free 10 min read

বাংলা সাহিত্যের আধুনিক যুগের সূচনা

By SHIKKHA GURU

ভূমিকা

বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসকে সাধারণত তিনটি প্রধান পর্বে ভাগ করা হয় — প্রাচীন যুগ (আনুমানিক ৬৫০-১২০০ খ্রিস্টাব্দ), মধ্যযুগ (আনুমানিক ১২০১-১৮০০ খ্রিস্টাব্দ), এবং আধুনিক যুগ (১৮০০ খ্রিস্টাব্দ থেকে বর্তমান পর্যন্ত)। আধুনিক যুগের সূচনাকাল নিয়ে সাহিত্য-ঐতিহাসিকদের মধ্যে মতভেদ থাকলেও, ঊনবিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধকেই এই যুগের সূচনাবিন্দু হিসেবে সাধারণভাবে চিহ্নিত করা হয়। এই লেখায় সেই রূপান্তরকালের প্রেক্ষাপট, পর্যায়ক্রম এবং সেই সময়ের উল্লেখযোগ্য লেখক ও তাঁদের গ্রন্থাবলি বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হলো।

যুগবিভাগ নিয়ে মতভেদ

  • সুকুমার সেন ১৮০১ সালে ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ প্রতিষ্ঠাকে আধুনিক যুগের সূচনাবিন্দু হিসেবে ধরেন।
  • অসিতকুমার বন্দ্যোপাধ্যায় ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্তের আবির্ভাবকাল (১৮৩০-এর দশক) থেকে আধুনিক যুগের প্রকৃত সূচনা বলে মনে করেন।
  • অনেক পণ্ডিত মাইকেল মধুসূদন দত্ত-র আবির্ভাবকে (১৮৬০-এর দশক) প্রকৃত আধুনিকতার সূচনা বলে চিহ্নিত করেন, কেননা তাঁর হাতেই বাংলা সাহিত্য পাশ্চাত্য আঙ্গিক ও ভাবধারার সাথে পূর্ণাঙ্গ সংযোগ স্থাপন করে।

এই মতভেদের ভিত্তিতে আধুনিক যুগকে সুবিধার জন্য কয়েকটি উপ-পর্যায়ে ভাগ করে আলোচনা করা যেতে পারে:

  1. প্রস্তুতি পর্ব / সন্ধিক্ষণ (১৮০০-১৮৩০) — ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ, শ্রীরামপুর মিশন
  2. প্রাক-আধুনিক গদ্য ও সাময়িকপত্র পর্ব (১৮৩০-১৮৬০) — ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত, রামমোহন রায়, বিদ্যাসাগর যুগ
  3. পূর্ণাঙ্গ আধুনিক যুগ (১৮৬০-এর পর) — মাইকেল মধুসূদন দত্ত, বঙ্কিমচন্দ্র, এবং পরবর্তী কবি-ঔপন্যাসিকগণ

আধুনিক যুগের সূচনার প্রেক্ষাপট ও কারণ

১. ব্রিটিশ শাসন ও পাশ্চাত্য শিক্ষার প্রভাব

পলাশীর যুদ্ধের (১৭৫৭) পর বাংলায় ব্রিটিশ শাসন প্রতিষ্ঠিত হওয়ার সাথে সাথে পাশ্চাত্য শিক্ষা, চিন্তাধারা ও সাহিত্যের সংস্পর্শে আসে বাঙালি সমাজ। ইংরেজি শিক্ষার প্রসার (হিন্দু কলেজ প্রতিষ্ঠা, ১৮১৭) বাঙালি মনীষীদের যুক্তিবাদ, ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবোধ ও বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গির সাথে পরিচিত করে।

২. ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ (১৮০০) ও তার লেখকগোষ্ঠী

কলকাতায় প্রতিষ্ঠিত ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ আধুনিক বাংলা গদ্যের বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ব্রিটিশ প্রশাসকদের বাংলা ভাষা শেখানোর উদ্দেশ্যে প্রতিষ্ঠিত এই কলেজে নিম্নলিখিত পণ্ডিতরা গদ্যরচনায় নিয়োজিত হন:

  • উইলিয়াম কেরি — কলেজের বাংলা বিভাগের প্রধান পণ্ডিত; কথোপকথন (১৮০১), বাংলা ব্যাকরণ রচয়িতা।
  • রামরাম বসু — প্রতাপাদিত্য চরিত্র (১৮০১), লিপিমালা (১৮০২)।
  • মৃত্যুঞ্জয় বিদ্যালঙ্কার — বত্রিশ সিংহাসন (১৮০২), হিতোপদেশ (১৮০৮), প্রবোধ চন্দ্রিকা (১৮৩৩)।
  • চণ্ডীচরণ মুন্শী — তোতা ইতিহাস (১৮০৫)।
  • হরপ্রসাদ রায় — পুরুষ পরীক্ষা (১৮১৫)।

এই রচনাগুলো সাহিত্যিক মূল্যে সীমিত হলেও আধুনিক বাংলা গদ্যের কাঠামো নির্মাণে এদের ঐতিহাসিক গুরুত্ব অপরিসীম। এদের হাতেই সাধু বাংলা গদ্যরীতির প্রাথমিক রূপ তৈরি হয়।

৩. শ্রীরামপুর মিশন ও মুদ্রণযন্ত্রের প্রসার

১৮০০ সালে উইলিয়াম কেরি, উইলিয়াম ওয়ার্ড ও জোশুয়া মার্শম্যান এর নেতৃত্বে শ্রীরামপুর মিশন প্রেস স্থাপিত হয়, যা বাংলা মুদ্রণের সূচনা করে। এখান থেকে বাইবেলের বঙ্গানুবাদ এবং বিভিন্ন পাঠ্যপুস্তক মুদ্রিত হয়। পরবর্তীতে গুরুত্বপূর্ণ সাময়িকপত্র প্রকাশিত হতে থাকে:

  • দিগ্দর্শন (১৮১৮) — জন ক্লার্ক মার্শম্যান সম্পাদিত, প্রথম বাংলা সাময়িকপত্র।
  • সমাচার দর্পণ (১৮১৮) — প্রথম বাংলা সংবাদপত্র, শ্রীরামপুর মিশন থেকে প্রকাশিত।
  • সংবাদ প্রভাকর (১৮৩১) — ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত সম্পাদিত, প্রথমে সাপ্তাহিক পরে দৈনিক।
  • তত্ত্ববোধিনী পত্রিকা (১৮৪৩) — অক্ষয়কুমার দত্ত সম্পাদিত, ব্রাহ্মসমাজের মুখপত্র।
  • বঙ্গদর্শন (১৮৭২) — বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় সম্পাদিত, আধুনিক বাংলা সাহিত্য-সাময়িকীর শ্রেষ্ঠ দৃষ্টান্ত।

মুদ্রণযন্ত্রের প্রসার সাহিত্যকে পুঁথি-নির্ভরতা থেকে মুক্ত করে ব্যাপক পাঠকগোষ্ঠীর কাছে পৌঁছে দেয়, যা আধুনিক সাহিত্যের বিকাশের অপরিহার্য শর্ত ছিল।

সামাজিক সংস্কার আন্দোলন ও প্রাবন্ধিক-গদ্যকারগণ

রামমোহন রায় (১৭৭২-১৮৩৩)

"আধুনিক ভারতের জনক" নামে পরিচিত রামমোহন রায় বাংলা প্রবন্ধ সাহিত্যের ভিত্তি স্থাপন করেন। তাঁর উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ:

  • বেদান্ত গ্রন্থ (১৮১৫)
  • বেদান্তসার (১৮১৫)
  • গোস্বামীর সহিত বিচার (১৮১৮)
  • সহমরণ বিষয়ে প্রবর্তক ও নিবর্তকের সম্বাদ (১৮১৮) — সতীদাহ প্রথার বিরুদ্ধে যুক্তিতর্ক
  • ব্রাহ্মণ সেবধি (পত্রিকা, ১৮২১)
  • সংবাদ কৌমুদী (পত্রিকা, ১৮২১)

তাঁর গদ্যরীতি জটিল ও সংস্কৃতঘেঁষা হলেও যুক্তিনির্ভর তর্ক-বিন্যাসের মাধ্যমে বাংলা প্রবন্ধকে একটি শক্তিশালী ভিত্তি প্রদান করে।

ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর (১৮২০-১৮৯১)

আধুনিক বাংলা গদ্যরীতির প্রকৃত রূপকার হিসেবে বিদ্যাসাগরকে গণ্য করা হয়। তাঁর ভাষা সহজ, স্বচ্ছ ও ছন্দোময়। উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ:

  • বেতাল পঞ্চবিংশতি (১৮৪৭) — অনুবাদ গ্রন্থ
  • বাংলার ইতিহাস (১৮৪৮)
  • জীবনচরিত (১৮৪৯)
  • বোধোদয় (১৮৫১)
  • বর্ণপরিচয় (প্রথম ও দ্বিতীয় ভাগ) (১৮৫৫) — বাংলা বর্ণমালা শিক্ষার আদর্শ পুস্তক
  • সীতার বনবাস (১৮৬০)
  • শকুন্তলা (১৮৫৪)
  • বিধবাবিবাহ প্রচলিত হওয়া উচিত কিনা এতদ্বিষয়ক প্রস্তাব (১৮৫৫)
  • বহুবিবাহ রহিত হওয়া উচিত কিনা এতদ্বিষয়ক বিচার (১৮৭১)

অক্ষয়কুমার দত্ত (১৮২০-১৮৮৬)

বিজ্ঞানভিত্তিক ও যুক্তিনির্ভর বাংলা গদ্যের অন্যতম পথিকৃৎ। উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ:

  • ভূগোল (১৮৪১)
  • পদার্থবিদ্যা (১৮৫৬)
  • চারুপাঠ (১ম, ২য়, ৩য় ভাগ) (১৮৫৩-৫৯)
  • ভারতবর্ষীয় উপাসক সম্প্রদায় (১৮৭০)

সাময়িকপত্র-কেন্দ্রিক কবিতা ও ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত

ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত (১৮১২-১৮৫৯) কে অনেকে মধ্যযুগ ও আধুনিক যুগের সন্ধিস্থলের কবি বলে অভিহিত করেন। তাঁর কবিতায় বিষয়বস্তু সমকালীন সমাজ-জীবন হলেও রীতি ছিল পুরনো পাঁচালী ও কবিওয়ালাদের ধাঁচের কাছাকাছি। তিনি সংবাদ প্রভাকর পত্রিকার মাধ্যমে বহু নতুন কবি-সাহিত্যিককে (যেমন বঙ্কিমচন্দ্র, দীনবন্ধু মিত্র) সাহিত্যজগতে পরিচিত করান। তাঁর গ্রন্থ:

  • সংবাদ প্রভাকর (সাময়িকপত্র, ১৮৩১)
  • প্রবোধ প্রভাকর (১৮৫৩)
  • বোধেন্দুবিকাশ (১৮৬৩, মরণোত্তর প্রকাশিত)

কাব্যক্ষেত্রে আধুনিকতার পূর্ণ সূচনা: মাইকেল মধুসূদন দত্ত

মাইকেল মধুসূদন দত্ত (১৮২৪-১৮৭৩) কে বাংলা সাহিত্যের প্রথম প্রকৃত আধুনিক কবি বলা হয়। তিনি বাংলা কবিতায় অমিত্রাক্ষর ছন্দ (মিলহীন পয়ার, blank verse) প্রবর্তন করেন এবং পাশ্চাত্য মহাকাব্যিক আঙ্গিকে বাংলা কাব্য রচনা করেন। তাঁর উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ:

  • তিলোত্তমাসম্ভব কাব্য (১৮৬০) — অমিত্রাক্ষর ছন্দে রচিত প্রথম কাব্য
  • মেঘনাদবধ কাব্য (১৮৬১) — নয় সর্গে বিভক্ত মহাকাব্য, রামায়ণের কাহিনি অবলম্বনে রচিত হলেও রাবণ-পুত্র মেঘনাদকে ট্র্যাজিক নায়ক রূপে উপস্থাপন
  • ব্রজাঙ্গনা কাব্য (১৮৬১)
  • বীরাঙ্গনা কাব্য (১৮৬২) — পত্রকাব্য (epistolary poems)
  • চতুর্দশপদী কবিতাবলী (১৮৬৬) — বাংলা ভাষায় সনেট (sonnet) রীতির প্রথম প্রয়োগ
  • শর্মিষ্ঠা (নাটক, ১৮৫৯) — প্রথম মৌলিক বাংলা নাটক
  • পদ্মাবতী (নাটক, ১৮৬০)
  • কৃষ্ণকুমারী (নাটক, ১৮৬১)
  • একেই কি বলে সভ্যতা (প্রহসন, ১৮৬০)
  • বুড়ো শালিকের ঘাড়ে রোঁ (প্রহসন, ১৮৬০)
  • হেকটর বধ (গদ্য অনুবাদ, ১৮৭১)

নাট্যসাহিত্যে আধুনিকতা

মাইকেল ছাড়াও এই সময়ে নাট্যসাহিত্যে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন:

  • দীনবন্ধু মিত্র (১৮৩০-১৮৭৩) — নীলদর্পণ (১৮৬০), নীলচাষিদের উপর অত্যাচারের চিত্র তুলে ধরা যুগান্তকারী নাটক; অন্যান্য নাটক: নবীন তপস্বিনী (১৮৬৩), লীলাবতী (১৮৬৭), জামাই বারিক (প্রহসন)।
  • রামনারায়ণ তর্করত্ন — কুলীনকুলসর্বস্ব (১৮৫৪), নবনাটক (১৮৬৬)।

উপন্যাস সাহিত্যের সূচনা

প্যারীচাঁদ মিত্র (১৮১৪-১৮৮৩)

ছদ্মনাম "টেকচাঁদ ঠাকুর"-এ রচিত তাঁর আলালের ঘরের দুলাল (১৮৫৮) কে বাংলা উপন্যাস সাহিত্যের প্রথম উল্লেখযোগ্য প্রচেষ্টা এবং কথ্যরীতির (আলালী ভাষা) প্রথম সার্থক ব্যবহার বলে গণ্য করা হয়।

কালীপ্রসন্ন সিংহ (১৮৪০-১৮৭০)

হুতোম প্যাঁচার নকশা (১৮৬১-৬২) — সমকালীন কলকাতার সমাজচিত্র তুলে ধরা ব্যঙ্গাত্মক রচনা, প্রাঞ্জল কথ্যরীতির চমৎকার নিদর্শন।

বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় (১৮৩৮-১৮৯৪)

"আধুনিক বাংলা উপন্যাসের জনক" হিসেবে পরিচিত বঙ্কিমচন্দ্র বাংলা উপন্যাসকে শৈল্পিক পূর্ণতা দান করেন। তাঁর গ্রন্থতালিকা:

  • দুর্গেশনন্দিনী (১৮৬৫) — প্রথম সার্থক বাংলা উপন্যাস
  • কপালকুণ্ডলা (১৮৬৬)
  • মৃণালিনী (১৮৬৯)
  • বিষবৃক্ষ (১৮৭৩)
  • চন্দ্রশেখর (১৮৭৫)
  • রজনী (১৮৭৭)
  • কৃষ্ণকান্তের উইল (১৮৭৮)
  • আনন্দমঠ (১৮৮২) — "বন্দে মাতরম" সংগীতের উৎসগ্রন্থ, স্বদেশপ্রেমমূলক উপন্যাস
  • দেবী চৌধুরাণী (১৮৮৪)
  • সীতারাম (১৮৮৬)
  • কমলাকান্তের দপ্তর (প্রবন্ধ-সংকলন, ১৮৭৫)
  • বঙ্গদর্শন (সাময়িকপত্র সম্পাদনা, ১৮৭২)

ভূদেব মুখোপাধ্যায় (১৮২৭-১৮৯৪)

অঙ্গুরীয় বিনিময় (১৮৭৫), পুষ্পাঞ্জলি (১৮৭৬) — ঐতিহাসিক ও সামাজিক বিষয় নিয়ে রচিত।

কাব্যক্ষেত্রে মাইকেল-উত্তর ধারা

  • হেমচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় (১৮৩৮-১৯০৩) — বৃত্রসংহার কাব্য (১৮৭৫), ভারত সঙ্গীত (১৮৭০), স্বদেশপ্রেমমূলক কবিতার জন্য পরিচিত।
  • নবীনচন্দ্র সেন (১৮৪৭-১৯০৯) — পলাশীর যুদ্ধ (১৮৭৫), রৈবতক-কুরুক্ষেত্র-প্রভাস (ত্রয়ী কাব্য)।
  • রঙ্গলাল বন্দ্যোপাধ্যায় (১৮২৭-১৮৮৭) — পদ্মিনী উপাখ্যান (১৮৫৮), যা পরবর্তীতে স্বদেশপ্রেমের প্রেরণাদায়ক কাব্য হিসেবে গণ্য হয়।
  • বিহারীলাল চক্রবর্তী (১৮৩৫-১৮৯৪) — গীতিকবিতার (lyric) পথপ্রদর্শক, রবীন্দ্রনাথের পূর্বসূরি বলে বিবেচিত; সঙ্গীত শতক (১৮৬২), বন্ধুবিয়োগ (১৮৭০), সারদামঙ্গল (১৮৭৯)।

রবীন্দ্র-পূর্ব যুগের পূর্ণতা ও রবীন্দ্রনাথের আবির্ভাব

উনবিংশ শতাব্দীর শেষভাগে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (১৮৬১-১৯৪১) এর আবির্ভাবের মাধ্যমে বাংলা সাহিত্যের আধুনিক যুগ পূর্ণতা লাভ করে। তাঁর প্রথম দিকের উল্লেখযোগ্য রচনা:

  • বনফুল (কাব্য, ১৮৮০)
  • সন্ধ্যাসঙ্গীত (১৮৮২)
  • প্রভাতসঙ্গীত (১৮৮৩)
  • মানসী (১৮৯০)
  • সোনার তরী (১৮৯৪)
  • ছোটগল্প-সংকলন (গল্পগুচ্ছ-এর প্রাথমিক গল্পগুলি, ১৮৯১ থেকে হিতবাদী, সাধনা পত্রিকায় প্রকাশিত)

রবীন্দ্রনাথের হাতে কবিতা, ছোটগল্প, উপন্যাস, নাটক, প্রবন্ধ — সাহিত্যের প্রতিটি শাখায় আধুনিকতার পূর্ণ বিকাশ ঘটে।

আধুনিক যুগের প্রধান সাহিত্যিক বৈশিষ্ট্য (সারসংক্ষেপ)

বৈশিষ্ট্য মধ্যযুগীয় সাহিত্য আধুনিক সাহিত্য
প্রধান রূপ পদ্য গদ্য ও পদ্য উভয়ই সমান গুরুত্বপূর্ণ
বিষয়বস্তু ধর্মীয়, পৌরাণিক সামাজিক বাস্তবতা, ব্যক্তিমানস
দৃষ্টিভঙ্গি সমষ্টিগত, ভক্তিমূলক ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদী, যুক্তিনির্ভর
আঙ্গিক মঙ্গলকাব্য, পাঁচালী উপন্যাস, ছোটগল্প, সনেট, অমিত্রাক্ষর ছন্দ
ছন্দ পয়ার, ত্রিপদী অমিত্রাক্ষর, মুক্তক ছন্দ
পৃষ্ঠপোষকতা রাজরাজড়া, জমিদার মুদ্রণযন্ত্র, সাময়িকপত্র, ব্যাপক পাঠকশ্রেণি

উপসংহার

বাংলা সাহিত্যের আধুনিক যুগের সূচনা একটি জটিল ও বহুস্তরীয় ঐতিহাসিক প্রক্রিয়া। ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের পণ্ডিতদের (উইলিয়াম কেরি, রামরাম বসু, মৃত্যুঞ্জয় বিদ্যালঙ্কার) হাতে গদ্যের প্রাথমিক কাঠামো নির্মিত হওয়ার পর, রামমোহন রায় ও বিদ্যাসাগরের হাতে তা যুক্তিনির্ভর ও পরিমার্জিত রূপ লাভ করে। ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্তের সাংবাদিকতা-কেন্দ্রিক কবিতার মধ্য দিয়ে সন্ধিক্ষণ অতিক্রম করে, মাইকেল মধুসূদন দত্তের হাতে (অমিত্রাক্ষর ছন্দ, মহাকাব্য, সনেট, আধুনিক নাটক) কবিতা সম্পূর্ণ নতুন আঙ্গিক লাভ করে। একই সময়ে প্যারীচাঁদ মিত্র ও বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের হাতে উপন্যাস একটি পরিণত শিল্পমাধ্যম হিসেবে প্রতিষ্ঠা পায়। এই সমগ্র যাত্রা চূড়ান্ত পূর্ণতা লাভ করে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের হাতে, যাঁর বহুমুখী প্রতিভা বাংলা সাহিত্যকে বিশ্বসাহিত্যের মানে উন্নীত করে।