রাজা রামমোহন রায়, ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত, প্যারীচাঁদ মিত্র, মদনমোহন তর্কালঙ্কার ও অক্ষয়কুমার দত্ত
### ১. রাজা রামমোহন রায় (১৭৭২-১৮৩৩)
**জীবনী**
রাজা রামমোহন রায় ১৭৭২ সালের ২২ মে হুগলি জেলার রাধানগর গ্রামে এক প্রাচীন ও সম্ভ্রান্ত কুলীন ব্রাহ্মণ পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা রামকান্ত রায় ছিলেন বৈদান্তিক দর্শনে বিশ্বাসী, আর মাতা তারিণী দেবী ছিলেন অত্যন্ত ধর্মপ্রাণা। শৈশবে তিনি গ্রামের পাঠশালায় বাংলা ও ফার্সি শিক্ষা লাভ করেন। পরে মুর্শিদাবাদে ফার্সি ও আরবি ভাষায় উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করেন। তরুণ বয়সে তিনি দেশ-বিদেশে দীর্ঘ পরিভ্রমণ করেন, যা তাঁর দৃষ্টিভঙ্গিকে প্রশস্ত করে। তিনি সংস্কৃত, ফার্সি, আরবি, ইংরেজি, গ্রিক ও ল্যাটিন—এই ছয়টি ভাষায় অসাধারণ পাণ্ডিত্য অর্জন করেন। ১৮০৩ থেকে ১৮১৪ সাল পর্যন্ত তিনি ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিতে দেওয়ানি ও মুনসেফি বিভাগে চাকরি করেন। চাকরিজীবন শেষ করে ১৮১৫ সালে তিনি কলকাতায় স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন এবং সমাজসংস্কার আন্দোলনে পূর্ণমনোনিবেশ করেন। ১৮৩০ সালে তিনি ইংল্যান্ডে গমন করেন এবং সেখানে মুঘল সম্রাটের প্রতিনিধি হিসেবে ব্রিটিশ পার্লামেন্টে সাক্ষ্য দেন। ১৮৩৩ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর ইংল্যান্ডের ব্রিস্টল শহরে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।
**সাহিত্য ও সমাজসংস্কারকর্ম**
রামমোহন রায় একাধারে দার্শনিক, ধর্মসংস্কারক, শিক্ষাবিদ ও সাহিত্যিক। তাঁর প্রথম প্রকাশিত গ্রন্থ 'তুহফাতুল মুওয়াহ্হিদিন' (একেশ্বরবাদীদের উপহার) ফার্সি ভাষায় রচিত। তিনি উপনিষদের বাংলা ও ইংরেজি অনুবাদ প্রকাশ করে সনাতন হিন্দুধর্মের বহুঈশ্বরবাদী আচারের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ জানান। ১৮২১ সালে তিনি 'ব্রাহ্মণিক ম্যাগাজিন' ও পরে 'সম্বাদ কৌমুদী' নামক বাংলা সাপ্তাহিক পত্রিকা প্রকাশ করেন, যা ছিল সংস্কার আন্দোলনের মুখপত্র। ১৮২৮ সালে তিনি কলকাতায় 'ব্রাহ্মসমাজ' প্রতিষ্ঠা করেন, যা ছিল একেশ্বরবাদী আন্দোলনের প্রথম সংগঠিত রূপ। তাঁর সর্বশ্রেষ্ঠ কীর্তি হলো সতীদাহ প্রথা বিরোধী আন্দোলন। তিনি প্রচুর পুস্তিকা, প্রতিবেদন এবং ইংরেজি সরকারের কাছে স্মারকলিপি প্রেরণ করে প্রমাণ করেন যে সতীদাহ প্রথা শাস্ত্রসম্মত নয়। তাঁর নিরলস প্রচেষ্টার ফলে ১৮২৯ সালে লর্ড উইলিয়াম বেন্টিঙ্ক সতীদাহ প্রথা বিলোপ আইন পাস করেন। শিক্ষাক্ষেত্রে তিনি ডেভিড হেয়ারের সাথে যৌথভাবে ১৮১৭ সালে হিন্দু কলেজ প্রতিষ্ঠা করেন এবং ১৮২৫ সালে নিজস্ব উদ্যোগে 'বেদান্ত কলেজ' স্থাপন করেন। তিনি বাংলা গদ্যের বিকাশেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন; তাঁর গদ্য ছিল সরল, প্রাঞ্জল ও যুক্তিনিষ্ঠ। 'গৌড়ীয় ব্যাকরণ', 'বেদান্ত গ্রন্থ', 'কোরান ও বেদের তুলনামূলক আলোচনা' তাঁর অন্যান্য উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ। ইংরেজি সরকার তাঁকে 'রাজা' উপাধিতে ভূষিত করে এবং তাঁর মৃত্যুর পর ভারতীয় উপমহাদেশের প্রথম আধুনিক মানুষ হিসেবে তাঁকে অভিহিত করা হয়।
---
### ২. ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত (১৮১২-১৮৫৯)
**জীবনী**
ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত ১৮১২ সালের ৬ মার্চ পশ্চিমবঙ্গের হুগলি জেলার কাঁচড়াপাড়ায় এক মধ্যবিত্ত বৈদ্য পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম হরিনারায়ণ গুপ্ত। মাত্র আট বছর বয়সে তিনি পিতৃহারা হন। অত্যন্ত দারিদ্র্যের মধ্যে তাঁর শৈশব ও কৈশোর কাটে। গ্রামের পাঠশালায় কিছুদিন পড়ার পর সংস্কৃত চর্চা শুরু করেন। পরে নিজের অক্লান্ত পরিশ্রমে তিনি বাংলা, সংস্কৃত, ফার্সি ও ইংরেজি ভাষায় বিশেষ পাণ্ডিত্য অর্জন করেন। জীবিকার তাগিদে তিনি কিছুদিন পুলিশ বিভাগে ও পরে কোম্পানির অফিসে চাকরি করেন। কিন্তু তাঁর প্রকৃত আগ্রহ ছিল সাহিত্য ও সাংবাদিকতায়। ১৮৩০-এর দশকে তিনি কলকাতায় এসে সাহিত্যজগতে প্রবেশ করেন এবং ধীরে ধীরে নিজস্ব প্রতিভার স্বাক্ষর রাখেন।
**সাহিত্যকর্ম ও সাংবাদিকতা**
ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত বাংলা সাংবাদিকতার ইতিহাসে এক অবিস্মরণীয় নাম। তিনি ১৮৩১ সালে 'সংবাদ প্রভাকর' নামে একটি সাপ্তাহিক পত্রিকা প্রকাশ শুরু করেন, যা পরে ১৮৩৯ সালে বাংলার প্রথম দৈনিক সংবাদপত্রে রূপান্তরিত হয়। দৈনিক পত্রিকা প্রকাশের এই উদ্যোগ বাংলার সংবাদমাধ্যমে এক বিপ্লব সৃষ্টি করে। তাঁর পত্রিকা ছিল সাহিত্য, সমাজ, রাজনীতি ও ধর্মবিষয়ক আলোচনায় সমৃদ্ধ। এই পত্রিকার মাধ্যমেই তিনি বাংলার মধ্যবিত্ত ও শিক্ষিত সমাজের কাছে জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন। সাহিত্য হিসেবে তিনি প্রধানত কবি ছিলেন। তাঁর কবিতায় ছিল আধুনিক জীবনের চিত্র, সমাজের ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ এবং দেশাত্মবোধের উজ্জ্বল দ্যোতনা। বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় তাঁকে 'খাঁটি বাঙালি কবি' বলে অভিহিত করেছেন, কারণ তাঁর কবিতায় গ্রামীণ ও শহুরে বাঙালি জীবনের বাস্তব প্রতিফলন ঘটেছে। তিনি 'যমক' অলঙ্কারের অসাধারণ ব্যবহার করতেন, যা তাঁর কবিতাকে ছন্দময় ও মধুর করে তুলেছিল। তাঁর উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থগুলির মধ্যে 'ভারতের ভাগ্য-বিপ্লব', 'কে', 'কৌলীন্য', 'তপসে মাছ', 'মাতৃভাষা' বিশেষভাবে প্রশংসিত। 'মাতৃভাষা' কবিতায় তিনি বাংলা ভাষার মাহাত্ম্য বর্ণনা করে প্রথমবারের মতো মাতৃভাষার প্রতি গভীর অনুরাগ প্রকাশ করেন। 'কৌলীন্য' কবিতায় তিনি সমাজের কুলীন ব্রাহ্মণদের অত্যাচার ও কুসংস্কারের তীব্র সমালোচনা করেন। প্রাথমিক জীবনে রক্ষণশীল হলেও পরবর্তীকালে তিনি ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের বিধবা বিবাহ আন্দোলনে সমর্থন জানান এবং নারীশিক্ষার পক্ষে মত প্রকাশ করেন। ১৮৫৯ সালের ২৩ জানুয়ারি তিনি কলকাতায় মৃত্যুবরণ করেন, কিন্তু তাঁর রচিত সংবাদ ও সাহিত্য বাংলা ভাষার ভাণ্ডারকে চিরসমৃদ্ধ করে রেখেছে।
---
### ৩. প্যারীচাঁদ মিত্র (১৮১৪-১৮৮৩)
**জীবনী**
প্যারীচাঁদ মিত্র ১৮১৪ সালের ২২ জুলাই কলকাতার শোভাবাজার এলাকায় এক সুপ্রসিদ্ধ বণিক পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম রামনারায়ণ মিত্র। তিনি হিন্দু কলেজে শিক্ষালাভ করেন এবং সেখানে অধ্যাপক ডেভিড হেয়ার ও হেনরি লুই ভিভিয়ান ডিরোজিওর সংস্পর্শে আসেন। ডিরোজিওর যুক্তিবাদী ও সংস্কারপন্থী চিন্তাধারা তাঁকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে। কলেজে পড়াকালীন তিনি 'ইয়ং বেঙ্গল' দলের অন্যতম সদস্য ছিলেন এবং সামাজিক কুসংস্কার ও অন্ধবিশ্বাসের বিরুদ্ধে সরব হন। শিক্ষাজীবন শেষে তিনি প্রথমে আইনব্যবসায় ও পরে সরকারি চাকরিতে যোগ দেন। তিনি কলকাতা মিউনিসিপ্যাল কর্পোরেশনের কমিশনার ও জাস্টিস অফ দ্য পিস ছিলেন। পাশাপাশি তিনি সমাজসংস্কার ও সাহিত্যচর্চায় নিরন্তর নিয়োজিত ছিলেন।
**সাহিত্যকর্ম**
প্যারীচাঁদ মিত্র 'টেকচাঁদ ঠাকুর' ছদ্মনামে সাহিত্যসাধনা করেন। ১৮৫৮ সালে প্রকাশিত তাঁর উপন্যাস 'আলালের ঘরের দুলাল' বাংলা সাহিত্যের প্রথম পূর্ণাঙ্গ উপন্যাস বলে স্বীকৃত। এই গ্রন্থে তিনি বাংলা গদ্যকে তার কৃত্রিম ও সংস্কৃত-নির্ভর জটিলতা থেকে মুক্ত করে সাধারণ মানুষের কথ্য ভাষায় লেখার নতুন ধারা সৃষ্টি করেন। তাঁর এই ভাষাশৈলী পরবর্তীকালে 'আলালী ভাষা' নামে পরিচিতি লাভ করে। উপন্যাসটি বাঙালি মধ্যবিত্ত সমাজের ব্যঙ্গাত্মক চিত্র, বিশেষত অশিক্ষিত জমিদার ও তাদের কলকাতা-মুখী সন্তানদের হাস্যরসাত্মক ও সমালোচনামূলক প্রতিকৃতি ফুটিয়ে তোলে। এটি ইংরেজিতে 'The Spoiled Child' নামে অনূদিত হয় এবং ইউরোপীয় সাহিত্য মহলে বাংলা উপন্যাসের পরিচয় করিয়ে দেয়। তাঁর অন্যান্য গ্রন্থের মধ্যে 'মদ খাওয়া বড় দায়' একটি সামাজিক ব্যঙ্গাত্মক রচনা, 'যৎকিঞ্চিৎ' প্রবন্ধসংগ্রহ এবং 'ডেভিড হেয়ারের জীবনচরিত' একটি জীবনীগ্রন্থ। তিনি ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, মদনমোহন তর্কালঙ্কার প্রমুখ সংস্কারকদের সহযোগী ছিলেন। স্ত্রীশিক্ষা, বিধবা বিবাহ, বাল্যবিবাহ ও বহুবিবাহ বিরোধী আন্দোলনে তিনি সক্রিয় অংশ নেন। ১৮৮৩ সালের ২৩ নভেম্বর তিনি কলকাতায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। বাংলা গদ্যকে তার শেকলমুক্ত করার জন্য তিনি বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে অমর হয়ে আছেন।
---
### ৪. মদনমোহন তর্কালঙ্কার (১৮১৭-১৮৫৮)
**জীবনী**
মদনমোহন তর্কালঙ্কার ১৮১৭ সালে নদীয়া জেলার শান্তিপুরের অদূরে এক কায়স্থ পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম রামনারায়ণ তর্কালঙ্কার। তিনি শৈশবে পিতৃহারা হন এবং অত্যন্ত কষ্টের মধ্যে তাঁর শিক্ষাজীবন শুরু হয়। গ্রামের পাঠশালায় প্রাথমিক শিক্ষা শেষে তিনি সংস্কৃত কলেজে ভর্তি হন। সেখানে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর ছিলেন তাঁর সমসাময়িক সহপাঠী ও ঘনিষ্ঠ বন্ধু। সংস্কৃত ভাষা ও ন্যায়শাস্ত্রে তিনি অসাধারণ পাণ্ডিত্য অর্জন করেন এবং 'তর্কালঙ্কার' উপাধি লাভ করেন। অল্প বয়সেই তিনি ফোর্ট উইলিয়াম কলেজে অধ্যাপক হিসেবে যোগ দেন। তাঁর শিক্ষকতা জীবন ছিল অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত, কিন্তু অত্যন্ত ফলপ্রসূ। তিনি ইংরেজি ও বাংলা ভাষাতেও সমান পারদর্শী ছিলেন এবং পাশ্চাত্য দর্শন ও বিজ্ঞান সম্পর্কে গভীর আগ্রহ ছিল তাঁর।
**সাহিত্য ও সমাজসংস্কারকর্ম**
মদনমোহন তর্কালঙ্কারের সর্বশ্রেষ্ঠ কীর্তি হলো শিশুশিক্ষার জন্য পাঠ্যপুস্তক রচনা। ১৮৪৯ সালে তিনি 'শিশুশিক্ষা' নামক প্রাথমিক পঠনপুস্তকের প্রথম ভাগ প্রকাশ করেন, যা ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের বিখ্যাত 'বর্ণপরিচয়'-এরও আগে প্রকাশিত হয়। এই গ্রন্থটি অতি সহজ ও সাবলীল ভাষায় রচিত এবং অল্পদিনেই ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করে। তাঁর রচিত 'আমার পণ' কবিতার প্রথম পংক্তি 'পাখী সব করে রব, রাতি পোহাইল' এখনও বাংলা পাঠ্যবইয়ের প্রথম পাতায় স্থান পেয়ে আসছে। তিনি বাংলা ভাষাকে সংস্কৃতের কঠিন বন্ধন থেকে মুক্ত করে সরল, হৃদয়গ্রাহী ও শিশুকেন্দ্রিক করতে বিশেষ ভূমিকা রাখেন। সমাজসংস্কার আন্দোলনেও তিনি ছিলেন অগ্রণী। ১৮৫৬ সালে বিধবা বিবাহ আইন পাস হওয়ার পর ১৮৫৭ সালে তিনি সর্বপ্রথম এই আইনের আওতায় বিধবা বিবাহের আয়োজন করেন এবং নিজের দুই কন্যাকে বেথুন স্কুলে ভর্তি করে নারীশিক্ষার উদাহরণ সৃষ্টি করেন। তিনি সংস্কৃত কলেজের পরিচালনা সমিতির সদস্য ছিলেন এবং শিক্ষাবিস্তারে বহু উদ্যোগ গ্রহণ করেছিলেন। কিন্তু অকালেই ১৮৫৮ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি মাত্র একচল্লিশ বছর বয়সে তিনি কলকাতায় মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর মৃত্যু বাংলার শিক্ষা ও সংস্কার আন্দোলনে এক অপূরণীয় শূন্যতা সৃষ্টি করে।
---
### ৫. অক্ষয়কুমার দত্ত (১৮২০-১৮৮৬)
**জীবনী**
অক্ষয়কুমার দত্ত ১৮২০ সালের ১৫ জুলাই বর্ধমান জেলার চুড়ামণিপুর গ্রামে এক দরিদ্র বায়ু বৈদ্য পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম পীতাম্বর দত্ত। শৈশবে তিনি গ্রামের পাঠশালায় সামান্য শিক্ষা লাভ করেন। পিতার মৃত্যুর পর অত্যন্ত দুঃখ-দারিদ্র্যের মধ্যে তাঁর জীবন কাটতে থাকে। কিন্তু অদম্য জ্ঞানপিপাসা তাঁকে স্বশিক্ষায় সংস্কৃত, ফার্সি, ইংরেজি ও জার্মান ভাষায় পাণ্ডিত্য অর্জনে সহায়তা করে। জীবিকার জন্য তিনি প্রথমে পুলিশ বিভাগে ও পরে কিছুদিন শিক্ষকতা করেন। ১৮৩৯ সালে তিনি কলকাতায় আসেন এবং সেখানে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, রাজনারায়ণ বসু প্রমুখ মনীষীদের সংস্পর্শে এলে তাঁর জ্ঞানচর্চা নতুন মাত্রা পায়। তিনি ব্রাহ্মসমাজে যোগ দেন এবং রাজা রামমোহন রায়ের আদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়ে সমাজসংস্কার ও বিজ্ঞানচর্চায় আত্মনিয়োগ করেন।
**সাহিত্য ও বিজ্ঞানচর্চা**
অক্ষয়কুমার দত্ত বাংলা ভাষায় বিজ্ঞানচর্চার এক অনন্য পথিকৃৎ। তিনিই প্রথম বাংলা ভাষায় বিজ্ঞানভিত্তিক পাঠ্যপুস্তক রচনা ও প্রকাশ করেন। ১৮৪১ সালে তিনি 'ভূগোল' নামে পৃথিবীর ইতিহাস ও ভূতত্ত্ববিষয়ক একটি গ্রন্থ রচনা করেন, যা বাংলায় প্রথম বৈজ্ঞানিক গ্রন্থ হিসেবে বিবেচিত হয়। ১৮৫২ সালে তাঁর সর্বশ্রেষ্ঠ গ্রন্থ 'বাহ্যবস্তুর সহিত মানব-প্রকৃতির সম্বন্ধ বিচার' প্রকাশিত হয়, যেখানে তিনি প্রকৃতি ও মানবজীবনের বৈজ্ঞানিক সম্পর্ক স্থাপন করেন। এই গ্রন্থটি বাংলা সাহিত্যে যুক্তিবাদী ও বৈজ্ঞানিক মননের সূচনা করে। 'পদার্থবিদ্যা' (১৮৫৬) ও 'চারুপাঠ' তাঁর অন্যান্য উল্লেখযোগ্য বৈজ্ঞানিক গ্রন্থ। তিনি 'তত্ত্ববোধিনী পত্রিকা'-র সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন এবং সেই পত্রিকার মাধ্যমে বিজ্ঞান, দর্শন ও নীতিশাস্ত্র নিয়ে অসংখ্য প্রবন্ধ রচনা করেন। তাঁর প্রবন্ধগুলিতে ছিল তীক্ষ্ণ যুক্তি, পর্যবেক্ষণনির্ভর বাস্তবতা এবং ধর্মীয় গোঁড়ামির বিরুদ্ধে সুস্পষ্ট অবস্থান। তিনি ব্রাহ্মসমাজের প্রার্থনায় সংস্কৃতের পরিবর্তে বাংলা ভাষার প্রচলন করেন, যাতে সাধারণ মানুষ ধর্মীয় অনুষ্ঠান বুঝতে পারে। তিনি স্ত্রীশিক্ষা ও বিধবা বিবাহের পক্ষে প্রবন্ধ লিখেছেন এবং জাতিভেদ প্রথা ও মূর্তিপূজার তীব্র সমালোচনা করেছেন। ১৮৮৬ সালের ২৮ মে তিনি কলকাতায় পরলোকগমন করেন। তাঁর রচিত গ্রন্থ ও প্রবন্ধ বাংলার চিন্তাজগতে বিজ্ঞানমনস্কতার যে ভিত্তি স্থাপন করে, তা পরবর্তী প্রজন্মের জন্য এক অমূল্য সম্পদ হয়ে রইল।